অবাধ্য স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে স্বামী বাধ্য নয় – হাইকোর্ট
মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর ভরণপোষণ (খোরপোষ) স্বামীর একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। স্বামী যতই গরিব হোক না কেন, তাতে স্ত্রীর এ অধিকার নষ্ট হয় না। এই দায়িত্ব স্বামীর ব্যক্তিগত দায়িত্ব, যা তিনি অন্য কারও ওপর স্থানান্তর করতে পারেন না। তবে স্ত্রীর ভরণপোষণ শর্তসাপেক্ষ — স্ত্রী যতদিন স্বামীর প্রতি আস্থাভাজন থাকবেন এবং স্বামীর ন্যায়সঙ্গত আদেশ পালন করবেন, ততদিন স্বামী তাকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবেন। [SOURCE: 14 DLR (HC) 455]
স্ত্রী কখন ভরণপোষণ পাবেন না
মুসলিম আইনের বিধান অনুযায়ী, নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে স্ত্রী ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার হারান:
১. স্বামীর অনুমতি ছাড়া অন্যত্র বসবাস: স্ত্রী স্বামীর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও স্বামী যেখানে অবস্থান করেন সেখানে না থেকে ভিন্ন অন্যত্র বসবাস করলে।
২. স্ত্রী বন্দিদশায় থাকলে: তবে স্বামী বন্দিদশায় থাকলে স্ত্রী ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত হবেন না।
৩. অন্যায়ভাবে গৃহত্যাগ: স্ত্রী অন্যায়ভাবে অবাধ্য হয়ে স্বামীর অনুমতি ছাড়া অসংগত কারণে স্বামীর গৃহ ত্যাগ করলে।
৪. ধর্মত্যাগ: স্ত্রী ধর্মত্যাগ করলে।
৫. অবাধ্যাচরণে বিবাহ বিচ্ছেদ: স্ত্রীর অবাধ্যাচরণের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে।
৬. ইদ্দত পালন: স্বামীর মৃত্যুজনিত কারণে ইদ্দত পালনরত থাকলে; তবে বিধবা অন্তঃসত্ত্বা হলে গর্ভ খালাস না হওয়া পর্যন্ত খোরপোষ পাবেন।
৭. অপহরণ: স্ত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে গেলে।
স্ত্রী কখন ভরণপোষণ পাবেন
নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে বসবাস না করেও ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন:
১. স্বামীর দুর্ব্যবহার: স্বামী যদি স্ত্রীর সঙ্গে অভ্যাসগতভাবে খারাপ ব্যবহার করেন, গৃহত্যাগের নির্দেশ দেন, তাড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেন, অথবা তাদের মধ্যকার সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে এটি নিরসন করা সম্ভব নয় — সেক্ষেত্রে স্ত্রী আলাদা বসবাস করেও খোরপোষ দাবি করতে পারেন। [SOURCE: 14 DLR (HC) 455]
২. আশু দেনমোহর পরিশোধ না হলে: স্ত্রী তার আশু দেনমোহর দাবি করলে স্বামী তা পরিশোধ না করলে স্ত্রী আলাদা বসবাস করেও ভরণপোষণ পেতে পারেন। [SOURCE: মো. ইব্রাহিম হোসেন সরকার বনাম মোসা. সোলেমান্নেসা, 19 DLR 751]
৩. বহুবিবাহ বা অন্য কারণ: স্বামী যদি পুনরায় বিবাহ করেন, ধর্মান্তরিত হন, ঘরে উপপত্নী রাখেন, বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন — এসব ক্ষেত্রেও স্ত্রী আলাদা থেকে খোরপোষ দাবি করতে পারেন।
ভরণপোষণ পরিশোধের নিয়ম ও পরিমাণ নির্ধারণ
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৯ ধারা অনুযায়ী, স্বামী যদি স্ত্রীকে যথাযথভাবে ভরণপোষণ প্রদানে ব্যর্থ হন, তবে স্ত্রী চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে পারেন। চেয়ারম্যান একটি সালিশি পরিষদ (Arbitration Council) গঠন করবেন, যা ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করে প্রত্যয়নপত্র প্রদান করবে। [SOURCE: Section 9, MFLO, 1961, bdlaws.minlaw.gov.bd]
ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণে বিবেচ্য বিষয়:
- স্ত্রীর পরিবারের সামাজিক পদমর্যাদা
- স্বামীর উপার্জন ও আর্থিক সক্ষমতা
- স্ত্রীর প্রয়োজন
স্ত্রীকে এমন পরিমাণ ভরণপোষণ মঞ্জুর করতে হবে যা দ্বারা তিনি যথাযথভাবে জীবনযাপন করতে পারেন। [VERIFICATION REQUIRED: 14 DLR 415 citation-এর পূর্ণ পাঠ যাচাই করতে হবে।]
ভরণপোষণ না পেলে স্ত্রীর প্রতিকার
মুসলিম বিবাহ-বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯-এর ২(ii) ধারা অনুযায়ী, স্বামী দুই বছর ধরে ভরণপোষণ প্রদানে ব্যর্থ হলে বা অবহেলা করলে স্ত্রী বিবাহ-বিচ্ছেদের ডিক্রি পাওয়ার অধিকারী হবেন। [SOURCE: Section 2(ii), Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939, bdlaws.minlaw.gov.bd]
সাফুরা খাতুন বনাম ওসমান গনি মোল্লা (১৯৫৭) ৯ ডিএলআর ৪৫৫ মামলায় আদালত বলেছেন, স্বামীর দেওয়া ভরণপোষণ ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনার মতো এবং সামান্য পরিমাণ অর্থ অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছিল। তাই ধরা হবে যে স্বামী কাবিননামার শর্ত পালন করেননি এবং স্ত্রী তালাক-ই-তাফবিজ (Talaq-i-Tafwid) ব্যবহার করে বিবাহ-বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। [SOURCE: 9 DLR 455]
বিয়ের প্রমাণ ও নিবন্ধনের গুরুত্ব
ভরণপোষণের জন্য প্রত্যয়নপত্র মঞ্জুর করার আগে পক্ষগণের ব্যক্তিগত আইনের সূত্রে বিয়ের বিষয়টি প্রমাণিত হতে হবে। যদি বিয়েটি অস্বীকার করা হয়, তবে বৈধ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল — এটি সন্তোষজনকভাবে প্রমাণের দায়িত্ব স্ত্রীর ওপর বর্তাবে। এ কারণেই বিয়ের নিবন্ধন ভরণপোষণ দাবির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর বাধ্যতামূলক দায়িত্ব, তবে তা শর্তসাপেক্ষ। স্ত্রী যদি স্বামীর প্রতি আস্থাভাজন থাকেন এবং ন্যায়সঙ্গত আদেশ পালন করেন, তবে তিনি ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী। স্বামী তা প্রদানে ব্যর্থ হলে স্ত্রী সালিশি পরিষদের মাধ্যমে প্রত্যয়নপত্র এবং প্রয়োজনে বিবাহ-বিচ্ছেদের ডিক্রি পেতে পারেন।
আইনি সতর্কীকরণ: এই লেখাটি সাধারণ আইনগত তথ্য ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। নির্দিষ্ট কোনো মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, তথ্য ও পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
আইনি সূত্র:
- The Muslim Family Laws Ordinance, 1961 — Section 9
- The Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939 — Section 2(ii)
- মিতা খান বনাম হেমায়েত বিবি, 14 DLR (HC) 455
- মো. ইব্রাহিম হোসেন সরকার বনাম মোসা. সোলেমান্নেসা, 19 DLR 751
- সাফুরা খাতুন বনাম ওসমান গনি মোল্লা, 9 DLR 455
FAQ
১. স্বামী গরিব হলে কি স্ত্রী ভরণপোষণ পাবেন না?
না। স্বামীর আর্থিক অবস্থা যাই হোক, স্ত্রীর ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার নষ্ট হয় না। তবে পরিমাণ নির্ধারণে স্বামীর সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়।
২. স্ত্রী কি আলাদা বসবাস করেও ভরণপোষণ পেতে পারেন?
হ্যাঁ, যদি স্বামী দুর্ব্যবহার করেন, আশু দেনমোহর পরিশোধ না করেন, বা পুনরায় বিবাহ করেন — এসব ক্ষেত্রে স্ত্রী আলাদা থেকে ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন।
৩. স্বামী দুই বছর ভরণপোষণ না দিলে স্ত্রী কী করতে পারেন?
মুসলিম বিবাহ-বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯-এর ২(ii) ধারা অনুযায়ী, স্ত্রী বিবাহ-বিচ্ছেদের ডিক্রির জন্য মামলা করতে পারেন।
৪. ভরণপোষণের পরিমাণ কীভাবে নির্ধারিত হয়?
স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদা, স্বামীর আর্থিক সক্ষমতা এবং স্ত্রীর প্রয়োজন বিবেচনা করে সালিশি পরিষদ পরিমাণ নির্ধারণ করে।
৫. বিয়ের নিবন্ধন না থাকলে কি ভরণপোষণ পাওয়া যায়?
বিয়ের নিবন্ধন ভরণপোষণ দাবির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ে অস্বীকার করা হলে বৈধ বিয়ের প্রমাণের দায়িত্ব স্ত্রীর ওপর বর্তাবে।
