দেনমোহর আদায়ে মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নীতিমালা চেয়ে হাইকোর্টের রুল
দীর্ঘ সময় পর দেনমোহর পরিশোধের ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। ১৩ জুলাই ২০২৬ (সোমবার) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই বিষয়ে রুল জারি করেছেন। আদালত বলেছেন, দেনমোহর বাকি বা ‘ডেফার্ড’ রাখার কোনো সুযোগ নেই; বিয়ের সময় বা পরপরই এটি পরিশোধ করা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক।
হাইকোর্ট কী আদেশ দিয়েছেন?
বিয়ের সময় নির্ধারিত দেনমোহর আদায় ও পরিশোধের নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন । আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ আইন কমিশনকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে । সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে ।
কে রিট করেছেন?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফাহমিদা আক্তার গত ৫ জুলাই ২০২৬ (রবিবার) জনস্বার্থে এই রিট আবেদন করেন । আদালতে রিটকারী পক্ষে তিনিই শুনানি করেন ।
রিটে কী বলা হয়েছে?
রিটে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় পর দেনমোহর আদায়ের ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নারীর আর্থিক অধিকার সুরক্ষায় মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ১০ ধারার অধীনে একটি নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন । রিটে সংবিধানের ৭, ২৭, ২৮ ও ৩১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে ।
দেনমোহরের আইনি ভিত্তি
রিটে বলা হয়েছে, আইন ও ধর্ম অনুযায়ী বিয়ে একটি সিভিল কন্ট্রাক্ট এবং দেনমোহর হচ্ছে সেই চুক্তির কনসিডারেশন। বিয়ে হওয়ার সময় থেকেই দেনমোহর পরিশোধ স্বামীর আইনগত বাধ্যবাধকতা। এটি স্বামীর ওপর একটি ঋণ হিসেবেও বর্তায় ।
স্বামী মারা গেলেও স্ত্রী তার প্রাপ্য দেনমোহর স্বামীর সম্পত্তি থেকে আদায় করতে পারেন। একইভাবে, কোনো স্ত্রী যদি দেনমোহর আদায় করার আগেই মারা যান, তাহলে তার সেই দাবি বিলুপ্ত হয় না। এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর বৈধ উত্তরাধিকারীরা স্বামীর কাছে মৃত স্ত্রীর প্রাপ্য দেনমোহর দাবি করতে পারবেন ।
মুদ্রাস্ফীতির উদাহরণ
রিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ২ লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করা হলেও ১ লাখ তাৎক্ষণিক পরিশোধিত হয় এবং বাকি ১ লাখ বিলম্বিত থাকে। ২০ বছর পর সেই বাকি ১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলে এর ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে যায়। ফলে স্ত্রী তার প্রকৃত আর্থিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন ।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
শুনানিতে হাইকোর্ট বলেছেন, “ধর্মীয় বিধান উপেক্ষা করে লোক দেখানো অতিরিক্ত দেনমোহর নির্ধারণের প্রবণতা থেকে নানা জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।” এ ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়াহর নীতিমালার বাইরে যাওয়া যাবে না বলেও আদালত মন্তব্য করেন ।
আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেছেন, “দেনমোহর বাকি বা ‘ডেফার্ড’ রাখার কোনো সুযোগ নেই। বিয়ের সময় বা পরপরই এটি পরিশোধ করা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক।” বিয়ের পর দীর্ঘ সময় ধরে দেনমোহর unpaid থাকার সামাজিক প্রথার কারণে নারীরা আর্থিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করেন ।
রুলের বিবাদীরা কারা?
রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে:
- আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব
- মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব
- ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব
- বাংলাদেশ আইন কমিশন
আইনি প্রেক্ষাপট
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ — ধারা ১০
এই ধারা অনুযায়ী, কাবিননামায় দেনমোহর পরিশোধের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ না থাকলে আদালত তা নির্ধারণ করবে। রিটে এই ধারার বিদ্যমান অস্পষ্টতা দূর করার কথা বলা হয়েছে ।
দেনমোহরের প্রকারভেদ
- Prompt Dower (তাৎক্ষণিক দেনমোহর): বিয়ের সময় বা পরপরই পরিশোধযোগ্য
- Deferred Dower (বিলম্বিত দেনমোহর): তালাক, বিবাহবিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যুর পর পরিশোধযোগ্য
- Proper Dower (উপযুক্ত দেনমোহর): কাবিননামায় উল্লেখ না থাকলে সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী নির্ধারিত
- Specified Dower (নির্দিষ্ট দেনমোহর): কাবিননামায় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখিত
সংবিধানের অনুচ্ছেদ
- ৭ অনুচ্ছেদ: সংবিধানের সর্বোচ্চ আইন
- ২৭ অনুচ্ছেদ: আইনের দৃষ্টিতে সমতা
- ২৮ অনুচ্ছেদ: নারী-পুরুষের সম অধিকার
- ৩১ অনুচ্ছেদ: আইনের庇护
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. হাইকোর্ট কী আদেশ দিয়েছেন? — ১৩ জুলাই ২০২৬ রুল জারি করেছেন; সংশ্লিষ্ট সচিবদের ৪ সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে
২. দেনমোহর কি বিলম্বিত রাখা যায়? — হাইকোর্টের মতে, দেনমোহর বাকি বা ‘ডেফার্ড’ রাখার কোনো সুযোগ নেই; বিয়ের সময় বা পরপরই পরিশোধ বাধ্যতামূলক
৩. মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব কী? — দীর্ঘ সময় পর একই অঙ্কের দেনমোহর পরিশোধ করলে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, ফলে স্ত্রী প্রকৃত আর্থিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন
৪. দেনমোহরের আইনি ভিত্তি কী? — মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ১০; বিয়ে সিভিল কন্ট্রাক্ট, দেনমোহর তার কনসিডারেশন
৫. পরবর্তী কী হবে? — ৪ সপ্তাহের মধ্যে জবাব দেওয়ার পর আদালত পরবর্তী আদেশ দেবেন
সংক্ষেপে
দীর্ঘ সময় পর দেনমোহর পরিশোধের ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। ১৩ জুলাই ২০২৬ বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের বেঞ্চ রুল জারি করেছেন। আইন, মহিলা ও শিশু, ধর্ম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং আইন কমিশনকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। হাইকোর্ট বলেছেন, দেনমোহর বাকি বা ‘ডেফার্ড’ রাখার কোনো সুযোগ নেই।
তথ্যসূত্র
সংবাদ সূত্র:
- যুগান্তর — ১৩ জুলাই ২০২৬
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ১৩ জুলাই ২০২৬
- কালের কণ্ঠ — ৫ জুলাই ২০২৬
- বাংলাদেশ প্রতিদিন — ১৪ জুলাই ২০২৬
- সমকাল — ১৩ জুলাই ২০২৬
- স্টার নিউজ — ১৩ জুলাই ২০২৬
- দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস — ১৩ জুলাই ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ — ধারা ১০
- সংবিধান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ — অনুচ্ছেদ ৭, ২৭, ২৮, ৩১
- দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ — ধারা ১৫১
আইনি সতর্কতা
এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো নির্দিষ্ট মামলার আইনি পরামর্শ নয়। রিটটি এখনো বিচারাধীন এবং কোনো চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়নি। আইনি পরামর্শের জন্য যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।
