সুপ্রিম কোর্ট: চুক্তিতে সালিশি ধারা থাকলে সরাসরি রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়

সালিশি

চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর সালিশি (Arbitration) ব্যবস্থা থাকলে সেই প্রতিকার গ্রহণ না করে সরাসরি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদন করা সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয় বলে রায় দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। M/S. AMS Faraj Construction v. Government of Bangladesh and others (Civil Appeal No. 47 of 2025) মামলায় গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দেওয়া রায়ে আপিল বিভাগ এ পর্যবেক্ষণ দেন। রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় ২৫ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে।

আইনি পটভূমি

সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ হাইকোর্ট বিভাগকে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে রিট জারি করার এখতিয়ার দেয়। তবে সুপ্রিম কোর্টের ধারাবাহিক সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, কোনো কার্যকর বিকল্প প্রতিকার (alternative remedy) বিদ্যমান থাকলে হাইকোর্ট সাধারণত রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করেন না। চুক্তিতে সালিশি ধারা থাকলে সেটি কার্যকর বিকল্প প্রতিকার হিসেবে বিবেচিত হয়।

মামলার ঘটনা

কুমিল্লার দৌলতপুরে অবস্থিত চিশতি টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করা হয় এবং লোকসানের কারণে একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। মিলটি বিক্রির জন্য বিভিন্ন সময়ে দরপত্র আহ্বান করা হলেও তা সফল হয়নি। এরপর ১ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে ৩৫ কোটি টাকায় মিলটি বিক্রির জন্য আপিলকারী M/S. AMS Faraj Construction-এর সঙ্গে একটি চুক্তি করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৫ কোটি টাকা এককালীন এবং বাকি ২০ কোটি টাকা পাঁচ কিস্তিতে পরিশোধের কথা ছিল। আপিলকারী মোট ২২ কোটি টাকা পরিশোধ করে মিলের দখল গ্রহণ করেন।

তবে পরবর্তীতে মিল বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দরপত্র ছাড়া বিক্রয়সহ বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করা হয়। এরপর সরকার চুক্তিটি সম্পন্ন করতে অস্বীকৃতি জানায়। চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আপিলকারী হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন করেন। হাইকোর্ট বিভাগ ১৫ জুন ২০১৫ তারিখে রায় দিয়ে সংশ্লিষ্টদের আপিলকারীকে মিলের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার সুযোগ দেওয়া, বকেয়া কিস্তি গ্রহণ এবং চুক্তি অনুযায়ী বিক্রয় দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

পরবর্তীতে সরকার ও সংশ্লিষ্টরা আপিল করলে আপিল বিভাগ Civil Appeal No. 181 of 2016-এ হাইকোর্টের রায় বাতিল করেন। এরপর আপিলকারী রিভিউ আবেদন করেন এবং সেই রিভিউ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় বর্তমান আপিলের সৃষ্টি হয়।

আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত আপিল বিভাগের বেঞ্চ এ রায় দেন। বেঞ্চের অন্য চার বিচারপতি হলেন — বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস.এম. এমদাদুল হক, বিচারপতি এ.কে.এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। ৩৭ পৃষ্ঠার রায়টি লিখেছেন বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।

মামলাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল চুক্তিতে থাকা সালিশি ধারা। আপিল বিভাগ উল্লেখ করেন, পক্ষগুলোর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিশির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ফলে চুক্তি বাস্তবায়ন, অর্থ পরিশোধ বা অন্যান্য চুক্তিগত অধিকার নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে চুক্তিতে নির্ধারিত সালিশি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু আপিলকারী সেই সালিশি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে রিট এখতিয়ারের আশ্রয় নেন।

আপিল বিভাগ বলেন, কোনো চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ও সমানভাবে কার্যকর বিকল্প প্রতিকার থাকলে সাধারণত সেই প্রতিকার গ্রহণ করতে হয়। বিশেষ করে চুক্তিতে সালিশি ধারা থাকলে এবং সেটি কার্যকর থাকলে, চুক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রথমে সেই ব্যবস্থাই অনুসরণ করা উচিত। আদালত এ বিষয়ে Bangladesh Telecom (Pvt.) Ltd. v. T&T, 48 DLR (AD) 1996 এবং Md. Mobarak Hossain v. Government of Bangladesh, VII ADC (2010) 835 মামলার নীতির ওপর নির্ভর করেন। এসব সিদ্ধান্তে চুক্তিতে নির্ধারিত কার্যকর সালিশি প্রতিকার থাকা অবস্থায় চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নের জন্য রিট এখতিয়ার ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে।

আপিল বিভাগ আরও বিবেচনা করেন যে, আপিলকারী চুক্তিতে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধের সময়সূচি যথাযথভাবে অনুসরণ করেননি। চুক্তি অনুযায়ী দ্বিতীয় কিস্তি ৩০ এপ্রিল ২০১৪-এর মধ্যে পরিশোধ করার কথা থাকলেও তা সময়মতো পরিশোধ করা হয়নি — যা প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে চুক্তিভঙ্গ হিসেবে উত্থাপন করা হয়। আদালতের দৃষ্টিতে, কোনো পক্ষ চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি করলে তাকে একই সঙ্গে চুক্তির শর্ত ও নিজের চুক্তিগত দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

আপিল বিভাগ আরও বলেন, রিভিউ কোনো মামলার পুনঃশুনানি নয়। রিভিউয়ের মাধ্যমে আগের সিদ্ধান্ত নতুন করে মূল্যায়ন করার সুযোগ সীমিত। রিভিউ গ্রহণের জন্য সাধারণত রেকর্ডে সুস্পষ্ট ভুল থাকতে হয়। আদালত দেখতে পান, আপিলকারী মূলত আগের আপিলে উত্থাপিত একই যুক্তিগুলো পুনরায় উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু আগের সিদ্ধান্তে এমন কোনো সুস্পষ্ট ভুল দেখাতে পারেননি, যা রিভিউয়ের মাধ্যমে সংশোধনের প্রয়োজন তৈরি করে।

রায়ের ফলাফল

সবশেষে আপিল বিভাগ চুক্তির শর্ত, সালিশি ধারার অস্তিত্ব, পক্ষগুলোর আচরণ এবং রিভিউয়ের সীমিত এখতিয়ার বিবেচনায় Civil Appeal No. 47 of 2025 খারিজ করেন। একই সঙ্গে মামলায় কোনো খরচের আদেশ দেননি। সর্বোপরি, চুক্তিতে সালিশি ধারা থাকলে বিরোধ দেখা দেওয়ার পর সেই ধারাকে উপেক্ষা করে সরাসরি রিটের আশ্রয় নেওয়া যাবে কি না, তা নির্ভর করবে বিকল্প প্রতিকারের কার্যকারিতা ও মামলার প্রকৃতির ওপর; তবে কার্যকর সালিশি প্রতিকার বিদ্যমান থাকলে সেটিই অনুসরণের ওপর আপিল বিভাগ বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

ব্যবহারিক প্রভাব

  • চুক্তিতে কার্যকর সালিশি ধারা থাকলে চুক্তিগত বিরোধে সরাসরি হাইকোর্টে রিট আবেদন না করে প্রথমে সালিশি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
  • চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি করলে নিজের চুক্তিগত দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
  • রিভিউ আবেদনে আগের আপিলের একই যুক্তি পুনরায় উপস্থাপন করা কার্যকর নয়; রেকর্ডে সুস্পষ্ট ভুল থাকতে হবে।

উপসংহার

আপিল বিভাগের এই রায় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, চুক্তিতে কার্যকর সালিশি প্রতিকার থাকলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে সরাসরি রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করা সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয়। চুক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তিতে সালিশি ধারাকে সম্মান করা এবং সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা পক্ষগুলোর জন্য আইনগতভাবে প্রত্যাশিত।


ডিসক্লেইমার: এই লেখাটি সাধারণ আইনগত তথ্য ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। নির্দিষ্ট কোনো মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, তথ্য ও পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।


Source Note (verified):

Source: Supreme Court of Bangladesh, Appellate Division
Case: M/S. AMS Faraj Construction v. Government of Bangladesh and others, Civil Appeal No. 47 of 2025
Court: Appellate Division
Bench: Chief Justice Zubayer Rahman Chowdhury, Justice Md Rezaul Haque, Justice SM Emdadul Haque, Justice AKM Asaduzzaman, Justice Farah Mahbub
Date: 22 February 2026
Relevant provision: Article 102, Constitution of Bangladesh

FAQ

১. চুক্তিতে সালিশি ধারা থাকলে কি সরাসরি হাইকোর্টে রিট করা যাবে?
না। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেছে, চুক্তিতে কার্যকর সালিশি প্রতিকার থাকলে সেই প্রতিকার গ্রহণ না করে সরাসরি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদন সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয়।

২. বিকল্প প্রতিকার কার্যকর কি না তা কে নির্ধারণ করবে?
আদালত মামলার প্রকৃতি ও বিকল্প প্রতিকারের কার্যকারিতা বিবেচনা করে নির্ধারণ করবেন। তবে কার্যকর সালিশি প্রতিকার বিদ্যমান থাকলে সেটিই অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৩. রিভিউ আবেদনে নতুন যুক্তি উপস্থাপন করা যাবে?
রিভিউ কোনো মামলার পুনঃশুনানি নয়। রিভিউ গ্রহণের জন্য রেকর্ডে সুস্পষ্ট ভুল থাকতে হবে। আগের আপিলের একই যুক্তি পুনরায় উপস্থাপন করা কার্যকর নয়।

৪. চুক্তিভঙ্গকারী পক্ষ কি রিট আবেদন করতে পারে?
আপিল বিভাগ বলেছে, যে পক্ষ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে, সে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য রিট আবেদন করে প্রতিকার পেতে পারে না।

৫. এই রায়ের প্রভাব কী?
চুক্তিতে কার্যকর সালিশি ধারা থাকলে চুক্তিগত বিরোধে সরাসরি রিট না করে প্রথমে সালিশি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.