কোম্পানির চেক ডিজঅনার: মামলা কোম্পানির বিরুদ্ধে নাকি পরিচালকের বিরুদ্ধে? ১৪০ ধারার ব্যাখ্যা

চেক

ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের চেক এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা কোম্পানির চেকের আইনি মারপ্যাঁচ সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোম্পানির দেওয়া চেক ডিজঅনার (Cheque Dishonor) হলে মামলা কার বিরুদ্ধে হবে—কোম্পানি নাকি তার পরিচালকদের বিরুদ্ধে? সব পরিচালককে আসামি করলেই কি মামলার জয় নিশ্চিত, নাকি বাদী নিজেই আইনি মারপ্যাঁচে ফেঁসে যেতে পারেন? আবার চেকে স্বাক্ষর না করেও কোনো নিষ্ক্রিয় পরিচালক কীভাবে বছরের পর বছর আদালতের চক্কর কাটছেন এবং এর থেকে মুক্তির উপায়ই বা কী? দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (NI) অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ধারা ১৩৮ ও ১৪০ এবং উচ্চ আদালতের সর্বশেষ বিভিন্ন নজির বিশ্লেষণ করলে এই জটিল বিষয়ের কিছু সূক্ষ্ম টেকনিক্যাল দিক পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

কোম্পানির চেক ও ব্যক্তিগত চেকের পার্থক্য

আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে একটি লিমিটেড কোম্পানি নিজেই একটি পৃথক আইনগত স্বত্ব (Separate Legal Entity)। কোম্পানির নামে সম্পত্তি কেনা, ভাড়া নেওয়া কিংবা মামলার পক্ষ হওয়া সম্ভব। কিন্তু কোম্পানির পক্ষে কোনো চুক্তি বা চেক ইস্যু হলে তা কোম্পানির পক্ষে অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে করতে হয়। ব্যক্তিগত চেকের ক্ষেত্রে ব্যক্তি নিজেই দায়ী, কিন্তু কোম্পানির চেকের ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণ হয় Section 140 অনুযায়ী।

Section 140 NI Act: কোম্পানির অপরাধ ও পরিচালকের দায়

এনআই অ্যাক্টের ১৪০(১) ধারা অনুযায়ী, অপরাধটি যদি কোনো কোম্পানি দ্বারা সংঘটিত হয়, তবে কোম্পানি নিজে এবং অপরাধের সময় কোম্পানির ব্যবসার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি—উভয়ই অপরাধী বলে গণ্য হবেন। ধারাটিতে বলা হয়েছে:

“If the person committing an offence under section 138 is a company, every person who, at the time the offence was committed, was in charge of, and was responsible to the company for the conduct of the business of the company, as well as the company, shall be deemed to be guilty of the offence and shall be liable to be proceeded against and punished accordingly.”

তবে ধারা ১৪০(২) অনুযায়ী, কোনো পরিচালক, ব্যবস্থাপক, সচিব বা কর্মকর্তা যদি প্রমাণ করতে পারেন যে অপরাধটি তার অজান্তে সংঘটিত হয়েছে অথবা তিনি এটি প্রতিরোধে যথাযথ তৎপরতা exercised করেছেন, তবে তিনি দায় থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

কোম্পানিকে পক্ষ করার বাধ্যবাধকতা ও আইনি বিতর্ক

এই ধারার ব্যাখ্যায় উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে কিছু ভিন্নধর্মী পর্যবেক্ষণ রয়েছে, যা মামলা করার আগে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত:

কোম্পানিকে ১ নম্বর আসামি করার বাধ্যবাধকতা: অনেক নজিরে দেখা গেছে, কোম্পানিকে আসামি না করে কেবল পরিচালকদের বিরুদ্ধে মামলা করায় পরবর্তীতে উচ্চ আদালত তা বাতিল (Quashment) করে দিয়েছেন। যেমন—Muslim Uddin v. State, 72 DLR (2020) 452 মামলায় দেখা যায়, যিনি চেকে স্বাক্ষর করেছেন তিনি হয়তো কোম্পানির প্রতিনিধি মাত্র। কোম্পানিকে যথাযথভাবে যুক্ত না করায় প্রাতিষ্ঠানিক দায় ব্যক্তির ঘাড়ে চাপানোর ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা তৈরি হয়।

কোম্পানিকে পক্ষ না করার ভিন্নমত: আবার, Alhaj Md. Harun-ur-Rashid and others v. State, 36 BLD (2016) 200 মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ উল্লেখ করেন যে, চেক ডিজঅনারের মামলায় কোম্পানিকে পক্ষ করা না হলে তা মামলার মারাত্মক ত্রুটি নয়। কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যাবলী পরিচালনায় জড়িত চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলতে আইনত বাধা নেই। [VERIFICATION REQUIRED: এই মামলার সঠিক রিপোর্ট নিশ্চিত করতে হবে।]

ভুল সংশোধনের সুযোগ: অন্যদিকে, Shariful Haque v. State, 70 DLR (2018) 209 মামলায় আদালত মন্তব্য করেছেন যে, মামলায় অনুরূপ ত্রুটি না রেখে নালিশী দরখাস্ত সংশোধনের মাধ্যমে কোম্পানিকে পক্ষ করে নেওয়াই উত্তম এবং ফৌজদারী কার্যবিধির ২২৭ ধারা অনুযায়ী চার্জ পরিবর্তনের সুযোগও রয়েছে। এই মামলার অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছে: “Shariful Haque (Md) vs. State represented by the Deputy Commissioner, 70 DLR (HCD), Page-209″।

শুধু কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা: Mohammad Yusuf Babu v. Jhon Provanjon Chowdhury, 3 LM (AD) 562 মামলায় আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো পরিচালক বা কর্মকর্তাকে পক্ষ না করে শুধুমাত্র কোম্পানির বিরুদ্ধেও ১৩৮ ধারায় মামলা চালানো সম্ভব। এতে কোম্পানির সম্পদ থেকে পাওনা আদায় সহজ হয়।

ঢালাওভাবে সব পরিচালককে আসামি করার পরিণতি

মামলা মজবুত করার উদ্দেশ্যে অনেক সময় নালিশি পিটিশনে কোম্পানির সব পরিচালকের নাম বসিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা হলো—আরজিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে, চেক ইস্যু এবং অপরাধ সংঘটনের সময় ওই পরিচালকরা কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে সরাসরি নিয়োজিত ছিলেন এবং তাদের জ্ঞাতসারেই এটি ঘটেছে। Md. Shahidul Alam v. State, 23 ALR (Vol-3) (HCD) 2021, 62 মামলায় বলা হয়েছে, ঢালাওভাবে সবাইকে আসামি করলে আদালত অনেক সময় তাদের অব্যাহতি দেন।

সাম্প্রতিক একটি হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে (Criminal Miscellaneous Case No. 13196 of 2023, রায়ের তারিখ ১৫.০২.২০২৬) স্পষ্ট করা হয়েছে: “a director cannot be held criminally liable merely by virtue of holding such office. Vicarious liability under section 140 arises only when it is proved that the accused director was in charge of and responsible for the conduct of the business of the company at the time when the offence was committed”। এই রায়ে একজন নিষ্ক্রিয় পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা বাতিল করা হয়েছে কারণ তিনি চেক ইস্যুর সময় কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন না।

আইনি নোটিশ জারির নিয়ম

কোম্পানির পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক চেকে স্বাক্ষর করলে এবং চেক ডিজঅনার হলে, মামলা দায়েরের আগে কেবল ওই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ওপর নোটিশ জারি করলেই চলবে, কোম্পানির ওপর আলাদাভাবে নোটিশ জারির প্রয়োজন নেই—এমনটিই সিদ্ধান্ত এসেছে Yousuf Babu v. State, 68 DLR (AD) 2016, 298 মামলায়। এই মামলার অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছে—বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে “68 DLR (AD) 298” হিসেবে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে কোম্পানিকে ১ নম্বর আসামি করে মামলা করলে অন্য পরিচালকদের জন্য পৃথক পৃথক নোটিশ জারির বাধ্যবাধকতা নেই।

নিষ্ক্রিয় পরিচালকদের মুক্তির উপায় (Section 561A)

যাঁরা কোম্পানির সাধারণ বা নিষ্ক্রিয় পরিচালক এবং দৈনন্দিন লেনদেনের সাথে যুক্ত নন, তাঁরা যদি ত্রুটিপূর্ণ মামলার কারণে বিড়ম্বনায় পড়েন, তবে কোম্পানি আইনের এই মৌলিক ত্রুটিগুলো (যেমন—ব্যবসায়িক পরিচালনায় তাঁর সুনির্দিষ্ট ভূমিকার অনুপস্থিতি) আদালতের সামনে তুলে ধরে ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৬১এ ধারা অনুযায়ী উচ্চ আদালতে ‘কোয়াশমেন্ট’ বা মামলা বাতিলের আবেদন করতে পারেন। Criminal Miscellaneous Case No. 13196 of 2023 মামলায় ঠিক এভাবেই একজন নিষ্ক্রিয় পরিচালক মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

Section 141-এর ২০২৬ সংশোধনী

উল্লেখ্য, ২০২৬ সালে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (সংশোধন) আইন পাশের মাধ্যমে Section 141(c) সংশোধন করা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, চেকের অঙ্ক ৫ লাখ টাকার বেশি হলে মামলা মেট্রোপলিটন জয়েন্ট সেশনস জাজ বা জয়েন্ট সেশনস জাজের আদালতে এবং ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচার্য হবে। এই সংশোধনী চেক ডিজঅনার মামলার বিচারিক এখতিয়ার পরিবর্তন করেছে।

উপসংহার

কাজেই, কোম্পানির চেকে লেনদেনের ক্ষেত্রে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর আগেই নিশ্চিত হোন চেকটি ব্যক্তিগত নাকি প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া। সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে যেমন পাওনা টাকা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে, ঠিক তেমনিভাবে নির্দোষ ব্যক্তিও আইনি হয়রানির শিকার হতে পারেন। Section 140-এর সঠিক প্রয়োগের জন্য পরিচালকের প্রকৃত ভূমিকা ও দায়িত্বের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা অপরিহার্য।


আইনি সতর্কীকরণ: এই লেখাটি সাধারণ আইনগত তথ্য ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। নির্দিষ্ট কোনো মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, তথ্য ও পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

লেখক: সিরাজ প্রামাণিক, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

আইনি সূত্র:

  • Negotiable Instruments Act, 1881 — Sections 138, 140, 141
  • Negotiable Instruments (Amendment) Act, 2026
  • Shariful Haque v. State, 70 DLR (2018) 209
  • Yousuf Babu v. State, 68 DLR (AD) 2016 298
  • Criminal Miscellaneous Case No. 13196 of 2023 (High Court Division, judgment dated 15.02.2026)
  • Phoenix Finance and Investment Limited v. Yeasmin Ahmed, XVIII ADC (AD) 490

FAQ

১. কোম্পানির চেক ডিজঅনার হলে মামলা কোম্পানির বিরুদ্ধে না পরিচালকের বিরুদ্ধে করতে হবে?
Section 140 NI Act অনুযায়ী, অপরাধটি কোম্পানির দ্বারা সংঘটিত হলে কোম্পানি এবং অপরাধের সময় কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি—উভয়েই দায়ী। তাই কোম্পানিকে পক্ষ করা উত্তম, তবে পরিস্থিতিভেদে কেবল পরিচালকের বিরুদ্ধেও মামলা করা যায়।

২. সব পরিচালককে আসামি করলেই কি মামলা সফল হবে?
না। আরজিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে, ওই পরিচালকরা অপরাধ সংঘটনের সময় কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে সরাসরি নিয়োজিত ছিলেন এবং তাদের জ্ঞাতসারেই এটি ঘটেছে। ঢালাওভাবে সবাইকে আসামি করলে আদালত তাদের অব্যাহতি দিতে পারেন।

৩. নিষ্ক্রিয় পরিচালকরা কীভাবে মামলা থেকে মুক্তি পেতে পারেন?
যাঁরা কোম্পানির দৈনন্দিন লেনদেনের সাথে যুক্ত নন, তাঁরা ৫৬১এ ধারার অধীনে উচ্চ আদালতে মামলা বাতিলের আবেদন করতে পারেন। সাম্প্রতিক হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে এ নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

৪. কোম্পানির চেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্বাক্ষর করলে নোটিশ কার কাছে পাঠাতে হবে?
কেবল ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে নোটিশ পাঠালেই চলবে; কোম্পানির কাছে পৃথক নোটিশ পাঠানোর বাধ্যবাধকতা নেই।

৫. Section 141-এর ২০২৬ সংশোধনীর প্রভাব কী?
২০২৬ সালের সংশোধনী অনুযায়ী, ৫ লাখ টাকার বেশি চেকের মামলা জয়েন্ট সেশনস জাজের আদালতে এবং ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচার্য হবে।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.