পাস হলো পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬: ডিজিটাল জালিয়াতিতে ৫ বছরের জেল

প্রায় ৪৫ বছর আগের বিদ্যমান আইন সংশোধন করে ডিজিটাল যুগের পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধ দমনে নতুন বিধান যুক্ত করে জাতীয় সংসদে ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ পাস হয়েছে। নতুন আইনে ডিজিটাল কারসাজি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, অবৈধ পরীক্ষা কেন্দ্র পরিচালনা, ডাটাবেজ হ্যাকিং এবং উত্তরপত্রের অন্যায্য মূল্যায়নের মতো অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

আইন পাসের বিবরণ

গত ৭ জুলাই ২০২৬ (মঙ্গলবার) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ২০তম দিনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন । স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন । জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাব নিষ্পত্তি শেষে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয় ।

এই আইনটি Public Examinations (Offences) Act, 1980 (Act No. XLII of 1980) এর অধিকতর সংশোধনকল্পে প্রণীত । পাসের পর এটি Public Examinations (Offences) (Amendment) Act, 2026 (২০২৬ সনের ১০০ নং আইন) হিসেবে পরিচিত হবে এবং ১৬ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে ।

আইনি প্রেক্ষাপট

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ-সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, প্রায় ৪৫ বছর আগে প্রণীত বিদ্যমান আইনটি নকল, প্রশ্নপত্র ফাঁস, জাল সনদ তৈরি এবং অন্যান্য পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়ম প্রতিরোধের জন্য করা হয়েছিল。তবে ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে আধুনিক কালের অপরাধ মোকাবিলায় আইনের অনেক বিধান অকার্যকর হয়ে পড়েছে ।

নতুন আইনের মূল বিধানসমূহ

১. ডিজিটাল কারসাজির সংজ্ঞা ও শাস্তি

প্রথমবারের মতো ‘ডিজিটাল কারসাজি’ (Digital Manipulation) এর আইনি সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। নতুন ধারা ২(aa) অনুযায়ী — পাবলিক পরীক্ষার ডাটাবেজে অননুমোদিত প্রবেশ, হ্যাকিং, তথ্য পরিবর্তন, সংশোধন, মুছে ফেলা বা গোপন করাকে ডিজিটাল কারসাজির আওতায় আনা হয়েছে ।

নতুন ধারা ৫A অনুযায়ী, কেউ ডিজিটাল কারসাজি করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে ।

২. নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ

নতুন ধারা ৩A অনুযায়ী, পরীক্ষা কর্তৃপক্ষের নিষিদ্ধ ঘোষিত ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশ বা প্রবেশের চেষ্টা করা এবং পরীক্ষা-সংক্রান্ত বৈধ নির্দেশনা ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে ।

৩. প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ফাঁস

বিদ্যমান ধারা ৪ প্রতিস্থাপন করে প্রশ্নপত্র বা উত্তরপত্র ফাঁসের শাস্তি আরও কঠোর করা হয়েছে। পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র বা উত্তরপত্র নিজের কাছে রাখা, প্রকাশ করা, প্রকাশ বা বিতরণ করলে — অনলাইন প্ল্যাটফর্মসহ যেকোনো মাধ্যমে — সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে । উল্লেখ্য, বিদ্যমান আইনে এই অপরাধের শাস্তি ছিল ১০ বছর, যা কমিয়ে ৫ বছর করা হয়েছে ।

৪. অবৈধ পরীক্ষা কেন্দ্র

নতুন ধারা ৯A অনুযায়ী, অননুমোদিত পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপন বা পরিচালনা করা অপরাধ। এ ধরনের কেন্দ্র পরিচালনায় জড়িত ব্যক্তি এবং জেনেশুনে অবৈধ পরীক্ষার জন্য নিজস্ব স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া মালিকদের সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে ।

৫. উত্তরপত্রের অন্যায্য মূল্যায়ন

নতুন ধারা ১০A অনুযায়ী, কোনো পরীক্ষক পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র অতিমূল্যায়ন (Over-assessment) বা অবমূল্যায়ন (Under-assessment) করলে তিনি সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। তবে তৃতীয় পরীক্ষকের মাধ্যমে অতিমূল্যায়ন বা অবমূল্যায়নের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না ।

৬. সংঘবদ্ধ পরীক্ষা অপরাধ

নতুন বিধানে ‘সংঘবদ্ধ পরীক্ষা অপরাধ’ (Organised Examination Crime) যুক্ত করা হয়েছে। কোনো পরীক্ষার্থীকে অসদুপায় অবলম্বনে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে পরীক্ষার্থীর সঙ্গে বা তার পক্ষে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে লিখিত বা মৌখিক চুক্তি করা বা করার প্রস্তাব দেওয়া অপরাধ। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে ।

৭. হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা

নতুন ধারা ১৩B অনুযায়ী, সদ্বিশ্বাসে পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধের তথ্য প্রকাশ করা হুইসেলব্লোয়ারদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাদের পরিচয় গোপন রাখা হবে এবং দেওয়ানি, ফৌজদারি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থেকে সুরক্ষিত রাখা হবে ।

৮. শিশু অপরাধীর বিশেষ বিধান

নতুন ধারা ১৩A অনুযায়ী, এই আইনের অধীনে কোনো শিশু অপরাধ করলে তাকে শিশু আইন, ২০১৩ এর বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।

৯. আমলযোগ্য অপরাধ

আইনের সব অপরাধ আমলযোগ্য (Cognizable) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারবে ।

১০. মামলা বিচারের পদ্ধতি

মামলাগুলো মেট্রোপলিটন এলাকায় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং অন্যান্য এলাকায় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক সারসংক্ষেপ বিচার পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি হবে ।

১১. বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা

সরকারকে নতুন ধারা ১৪A এর মাধ্যমে অফিসিয়াল গেজেটে প্রজ্ঞাপন জারি করে সংশোধিত আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ।

পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

১. ডিজিটাল কারসাজির শাস্তি কী? — সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।

২. নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে প্রবেশের শাস্তি কী? — সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।

৩. উত্তরপত্রের অন্যায্য মূল্যায়নের শাস্তি কী? — সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড; তৃতীয় পরীক্ষকের মাধ্যমে যাচাই বাধ্যতামূলক।

৪. প্রশ্নপত্র ফাঁসের শাস্তি কী? — ৫ বছর কারাদণ্ড (পূর্বে ছিল ১০ বছর)।

৫. হুইসেলব্লোয়াররা কি সুরক্ষা পাবেন? — হ্যাঁ, নতুন ধারা ১৩B অনুযায়ী আইনি সুরক্ষা পাবেন।

৬. শিশু অপরাধীর কী হবে? — শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংক্ষেপে

জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’। নতুন আইনে ডিজিটাল কারসাজি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ, অবৈধ পরীক্ষা কেন্দ্র পরিচালনা, সংঘবদ্ধ পরীক্ষা অপরাধ এবং উত্তরপত্রের অন্যায্য মূল্যায়নের মতো অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। প্রথমবারের মতো ডিজিটাল কারসাজির আইনি সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে এবং হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষার বিধান রাখা হয়েছে। সব অপরাধ আমলযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র

সংবাদ সূত্র:

  • বাসস — ৭ জুলাই ২০২৬
  • প্রথম আলো — ৭ জুলাই ২০২৬
  • দ্য ডেইলি স্টার — ৭ জুলাই ২০২৬
  • বাংলা ট্রিবিউন — ৭ জুলাই ২০২৬
  • দেশ টিভি — ৭ জুলাই ২০২৬
  • যুগান্তর — ৮ জুলাই ২০২৬
  • নিউ এজ — ২৭ আগস্ট ২০২৬

প্রাথমিক আইনি সূত্র:

  • Public Examinations (Offences) (Amendment) Act, 2026 (Act No. 100 of 2026)
  • Public Examinations (Offences) Act, 1980 (Act No. XLII of 1980)
  • শিশু আইন, ২০১৩

আইনি সতর্কতা

এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো নির্দিষ্ট মামলার আইনি পরামর্শ নয়। এই নিবন্ধে উল্লেখিত আইন ও ধারাগুলো সময়ের সাথে সংশোধিত হতে পারে; সর্বশেষ সংশোধনী যাচাই করে নিন। আইনি পরামর্শের জন্য যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.