গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য ও জামিন-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি; তদন্ত ও বিচার ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য
গুমের অপরাধ দমনে নতুন আইনি কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ হিসেবে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৫তম বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রণীত খসড়া আইনে গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বিভিন্ন শাস্তি ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য এবং আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, গুমের কারণে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে অথবা গুম হওয়ার পাঁচ বছর পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় খুঁজে না পাওয়া গেলে অভিযুক্তের জন্য মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
আইনের উদ্দেশ্য হিসেবে মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গুম প্রতিরোধ, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান নিশ্চিত করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের জন্য একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
খসড়া আইনে আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি করে গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তি পলাতক থাকলেও বিচার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ, ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণের বিধান এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীদের পরিচয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এতে ভুক্তভোগীদের তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের জন্য পৃথক তহবিল গঠন, দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা এবং তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিধানও রাখা হয়েছে।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের ভরণপোষণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যাবে। এছাড়া গুমের পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের উদ্দেশ্যে গুম সনদ প্রদান, একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যে উভয় প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গুম প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগীদের অধিকার সুরক্ষায় প্রস্তাবিত এই আইন কার্যকর হলে দেশে গুমসংক্রান্ত অপরাধের বিচার, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের জন্য একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।