দিল্লিতে এনএসএর ধারা ৩(২) প্রয়োগ নিয়ে মানবাধিকার, প্রশাসনিক আটক ও ন্যায্য বিচারের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি।
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ)-এর ধারা ৩(২) প্রয়োগের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায়, দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর ১৫ জুলাই এই ধারা কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে পুলিশ প্রশাসনিক আদেশে ব্যক্তিদের আটক রাখার বিস্তৃত ক্ষমতা পায়। অ্যামনেস্টির মতে, এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে যখন ভারতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে যুবসমাজের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভকারীরা দায়ীদের জবাবদিহি এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানিয়ে আন্দোলন করে আসছেন। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (NEET-UG)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পর এ আন্দোলনের সূত্রপাত হয় এবং এতে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য হন।
অ্যামনেস্টি জানায়, এনএসএর ধারা ৩(২) প্রয়োগের মেয়াদ ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে সংস্থাটির ভারত শাখার চেয়ারম্যান আকার প্যাটেল বলেন, এই পদক্ষেপ মানবাধিকারের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় এবং এটি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। তার মতে, আইনের এই বিধান পুলিশকে সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত প্রশাসনিকভাবে আটক রাখার ক্ষমতা দেয়। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিরা আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আটকের কারণও জানতে পারেন না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দিল্লি পুলিশ এ সিদ্ধান্তকে একটি নিয়মিত প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে অ্যামনেস্টি দাবি করেছে, অতীতেও অনুরূপ ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। সংস্থাটি ২০২০ সালের সিএএ-বিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৬ সালের নয়ডার শ্রমিক বিক্ষোভের সময়ও একই ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, এর জেরে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের দাবির মুখে আন্দোলন আরও জোরদার হয়। বিক্ষোভকারীরা পরীক্ষা সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের দাবিও উত্থাপন করেন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে সংসদের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
অ্যামনেস্টির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ছাত্র বিক্ষোভকারীদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে, যা আন্দোলনকে আরও উসকে দেয় বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
এনএসএ-এর অধীনে কোনো ব্যক্তিকে অভিযোগ গঠন বা বিচার ছাড়াই জনশৃঙ্খলা কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকির সন্দেহে প্রশাসনিকভাবে আটক করা যেতে পারে। আটক হওয়ার পর তার মামলাটি একটি তিন সদস্যের উপদেষ্টা বোর্ড পর্যালোচনা করলেও সেখানে আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থাকে না।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দাবি করেছে, জাতীয় নিরাপত্তা আইনের এই বিধান আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত চুক্তি (আইসিসিপিআর)-এর অনুচ্ছেদ ৯-এ বর্ণিত ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার এবং অনুচ্ছেদ ১৪-এ নিশ্চিত ন্যায্য বিচারের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংস্থাটি এ বিষয়ে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
মানবাধিকার, প্রশাসনিক আটক এবং জাতীয় নিরাপত্তার ভারসাম্য নিয়ে ভারতের এই পদক্ষেপ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতি সেই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে, যদিও এ বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অবস্থান হলো, এটি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা।