কাবিননামায় আগের বিয়ে, সন্তান ও এনআইডি তথ্য যুক্ত করতে হাইকোর্টের রুল
বিবাহে তথ্য গোপন ও প্রতারণা রোধে কাবিননামায় বর-কনের পূর্ববর্তী ও বিদ্যমান বিয়ে, সন্তান এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (সোমবার) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন।
কী ঘটেছে?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান জনস্বার্থে এই রিট আবেদনটি দায়ের করেন। এর আগে গত ২০ আগস্ট ২০২৬-এ তিনি আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শককে আইনি নোটিশ পাঠান। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯-এর অধীনে ব্যবহৃত বাংলাদেশ ফরম নম্বর ১৬০১ বা ‘ফরম ঘ’—কাবিননামাটি অসম্পূর্ণ ও অসমতাপূর্ণ।
আদালতে কী হয়েছে?
প্রাথমিক শুনানিতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শেখ ওমর ও তানজিলা রহমান জুঁই। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খান জিয়াউর রহমান। শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিবাদীদের প্রতি রুল জারি করেন এবং চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেন।
রুলে কী জানতে চাওয়া হয়েছে?
আদালত জানতে চেয়েছেন, কাবিননামায় বর ও কনের আগের ও বিদ্যমান বিয়ে, সন্তান এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না। পাশাপাশি, ফরম সংশোধন ও হালনাগাদে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না — তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
রিটের দাবি
রিটে উল্লেখ করা হয়, বর্তমান কাবিননামায় বরের বিদ্যমান স্ত্রী এবং সালিশি পরিষদের অনুমতির বিষয়ে কিছু তথ্য চাওয়া হলেও তার আগের সব বিয়ে, তালাক, সাবেক স্ত্রী ও সন্তানদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য উল্লেখের বাধ্যবাধকতা নেই। একইভাবে কনের ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তী বৈবাহিক ইতিহাস যাচাইয়ের সমতাভিত্তিক ব্যবস্থা অনুপস্থিত। এসব তথ্য গোপন করে পরবর্তী বিয়েতে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ থাকায় প্রতারণা ও পারিবারিক বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে বলে রিটে অভিযোগ করা হয়।
রিটে কাবিননামা সংশোধন করে বর-কনে উভয়ের আগের ও বিদ্যমান সব বিয়ের তথ্য, সন্তানদের তথ্য, চলমান ভরণপোষণ, অভিভাবকত্ব ও অন্যান্য আইনগত দায় এবং জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা পাসপোর্ট নম্বর অন্তর্ভুক্ত ও যাচাইযোগ্য করার নির্দেশনা চাওয়া হয়।
আইনি প্রেক্ষাপট
কাবিননামা বর্তমানে পরিচালিত হয় মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯-এর অধীনে। এই বিধিমালার ফরম নম্বর ১৬০১-এ বরের বিদ্যমান স্ত্রী ও সালিশি পরিষদের অনুমতির কিছু তথ্য থাকে, কিন্তু আগের বিয়ে, তালাক ও সন্তানদের সম্পূর্ণ তথ্য থাকে না। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, বিদ্যমান বিয়ে থাকা অবস্থায় নতুন বিয়ের ক্ষেত্রে সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ডিজিটালাইজ করার নির্দেশ দিয়ে রায় দেন। সেই রায়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়। তবে মূল কাবিননামার ফরমে প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘর এখনো সংযোজিত হয়নি।
মামলার বর্তমান অবস্থা
এই মামলাটি এখন রুল পর্যায়ে। অর্থাৎ, হাইকোর্ট বিবাদীদের কাছে জানতে চেয়েছেন কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না। বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। এখনো কোনো চূড়ান্ত রায় হয়নি। রুলের জবাব পাওয়ার পর আদালত পরবর্তী আদেশ দেবেন।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
রুল মানে কী? হাইকোর্ট যখন কোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চান, তখন তাকে রুল বলা হয়। এটি চূড়ান্ত রায় নয়। কর্তৃপক্ষ জবাব দিলে আদালত শুনানি করে সিদ্ধান্ত নেন।
বিয়ের আগে কী জানা উচিত? বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি চুক্তি। তাই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পাত্র-পাত্রীর পূর্ববর্তী বৈবাহিক অবস্থা, সন্তান ও আইনগত দায় সম্পর্কে জেনে নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
বর্তমানে কাবিননামায় আগের বিয়ের তথ্য দিতে হবে কি? এখনো বাধ্যতামূলক নয়। হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন; চূড়ান্ত রায় বা সংশোধিত ফরম প্রকাশিত হয়নি। তাই বর্তমানে প্রচলিত ফরম অনুযায়ীই নিবন্ধন চলছে।
সংক্ষেপে
- হাইকোর্ট ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ রুল জারি করেছেন।
- রুলে কাবিননামায় আগের বিয়ে, সন্তান ও এনআইডি তথ্য অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না — তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
- রিট আবেদনকারী: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান।
- বিবাদী: আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব, নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক।
- মামলাটি এখন রুল পর্যায়ে; চূড়ান্ত রায় হয়নি।
তথ্যসূত্র
- প্রথম আলো — ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- যুগান্তর — ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- বাংলাদেশ প্রতিদিন — ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- এনটিভি — ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- প্রথম আলো — ২৫ আগস্ট ২০২৬
- যুগান্তর — ২৫ আগস্ট ২০২৬
- আইন ও বিচার বিভাগ — মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়। মামলাটি এখনো বিচারাধীন; কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আইনি পরামর্শের জন্য যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।
