বার কাউন্সিলের আইনজীবী তালিকাভুক্ত হয়ে ব্যবসা-চাকরিতে যুক্তদের চিহ্নিত করে লাইসেন্স বাতিলের দাবিতে ৫ দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে আইনি নোটিশ প্রেরণ।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে দ্বৈত পেশা ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে জড়িত আইনজীবীদের প্র্যাক্টিসিং লাইসেন্স বাতিলের দাবিতে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। আজ বুধবার (১২ আগস্ট) ডাকযোগে (রেজিস্টার্ড এ/ডি) প্রেরিত এই নোটিশে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, বার কাউন্সিলের সচিব, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান, ভিজিল্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান এবং রোল ও প্রকাশনা কমিটির চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে। নোটিশে আগামী ৫ কর্মদিবসের মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে হাইকোর্টে রিট করার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ওকালতি একটি মহান, স্বাধীন ও সম্মানজনক পেশা। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, বার কাউন্সিল থেকে সনদ গ্রহণের পর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তি আদালতের পরিবেশে আইনচর্চায় সম্পৃক্ত না থেকে শুধু ‘অ্যাডভোকেট’ পরিচয়টিকে সামাজিক প্রভাব বিস্তার বা ব্যবসায়িক সুবিধার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। নোটিশদাতা ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া উল্লেখ করেন, এসব সনদধারী আইনজীবী বাস্তবে কার শোরুম, ইট-বালি-সিমেন্ট সরবরাহ, ম্যানপাওয়ার বা দালালি ব্যবসা, ঠিকাদারি, পরিবহন ব্যবসাসহ মোবাইল ফ্লেক্সিলোড ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (বিকাশ-নগদ) দোকান পরিচালনায় জড়িত। এছাড়া অনেকে সনদ সমর্পণ না করেই বিদেশে অবস্থান করছেন বা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা ও করপোরেট সংস্থায় পূর্ণকালীন বা খণ্ডকালীন চাকরি করছেন।
আইনি ভিত্তি প্রসঙ্গে নোটিশে বলা হয়, দ্য বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল রুলস, ১৯৭২-এর ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত আইনজীবী ব্যবসা বা অন্য কোনো লাভজনক কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারেন না। এটি পেশাগত অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হয়। একইভাবে, ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট অ্যান্ড এটিকেট-এর অধ্যায়-৪, রুল ৮ অনুযায়ী সক্রিয় সনদ রেখে ভিন্ন পেশায় যুক্ত থাকা স্পষ্টতই পেশাগত নৈতিকতার পরিপন্থী। সংবিধানের ২০(১), ৩১ ও ৪০ অনুচ্ছেদের সঙ্গেও এ ধরনের দ্বৈত পেশা সাংঘর্ষিক বলে নোটিশে দাবি করা হয়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ড. হানিরাজ এল. চুলানি বনাম বার কাউন্সিল অব মহারাষ্ট্র অ্যান্ড গোয়া মামলায় এবং যুক্তরাজ্যের বার স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড ও আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের নীতিমালায় স্পষ্টভাবে ওকালতিকে পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
নোটিশদাতা জানান, ২০১৯ সালের ২ ডিসেম্বর এবং ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি বার কাউন্সিলে এ বিষয়ে লিখিত আবেদন করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমানে এ নোটিশের মাধ্যম তিনি তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেছেন। প্রথমত, সক্রিয় আইনচর্চার পরিবর্তে ব্যবসা বা চাকরিতে নিযুক্ত আইনজীবীদের চিহ্নিত করতে উচ্চস্তরের তদন্ত কমিটি গঠন। দ্বিতীয়ত, জাতীয় পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নন-প্র্যাক্টিসিং আইনজীবীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সনদ সমর্পণের নির্দেশ দেওয়া। তৃতীয়ত, নির্ধারিত সময়ে সনদ সমর্পণ না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রক্রিয়া শুরু করে লাইসেন্স বাতিল করা। নোটিশে সাফ জানানো হয়, নির্ধারিত ৫ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে।
আইন পেশার পবিত্রতা রক্ষা ও সক্রিয় আইনজীবীদের প্রতি সম্মান নিশ্চিতে প্রেরিত এই আইনি নোটিশ পেশাগত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এলো। বার কাউন্সিল আগামী কয়েকদিনের মধ্যে কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বিষয়টি আদালতে গড়াবে কি না।