জয়পুরহাট আদালতের নির্দেশে মামলা নথিভুক্ত; চুক্তির টাকা না পাওয়ার অভিযোগে দিনমজুরের আইনি লড়াই।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দিনমজুর মন্টু মিয়া দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ১০ লাখ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে তাকে নেপালে নিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করানো এবং দেশে ফেরার পর প্রতিশ্রুত অর্থ না দেওয়ার অভিযোগে জয়পুরহাট আদালতে মামলা করেছেন। আদালতের নির্দেশে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন-সংক্রান্ত আইনের আওতায় মামলাটি কালাই থানায় এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। মামলায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে আরও তিন থেকে চারজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার বাদী মন্টু মিয়া গত ১৩ জুন জয়পুরহাটের আমলি আদালত-৫-এ মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে পরদিন ১৪ জুন কালাই থানায় মামলাটি নথিভুক্ত হয়। মামলায় আসামি করা হয়েছে বগুড়া সদরের নিশিন্দারা গ্রামের সাব্বির আহমেদ, শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক মল্লিকপাড়া গ্রামের সুমন আলী, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, লওনা গ্রামের আব্দুস ছাত্তার এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছোট হোসেনপুর রাজাগঞ্জ এলাকার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরীকে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিদের মধ্যে তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরী কিডনি ক্রয়-বিক্রয়ের মহাজন হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ঢাকার রায়েরবাগ এলাকায় অবস্থান করে জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন স্থানে দালাল নিয়োগের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষকে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে দেশে ও বিদেশে কিডনি ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত।
এজাহারে মন্টু মিয়া উল্লেখ করেন, সংসারের অভাব-অনটন দূর করতে তিনি বিভিন্ন এনজিও ও স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। সেই সুযোগে স্থানীয় দালালরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানায়, ঢাকার এক নারী কিডনি জটিলতায় ভুগছেন এবং একটি কিডনির বিনিময়ে তাকে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে। এই প্রস্তাবে তিনি সম্মতি দেন।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সম্মতি দেওয়ার পর আসামিরা তার পাসপোর্ট তৈরি করে দেন এবং চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে চুক্তির বাইরে ৫০ হাজার টাকা প্রদান করেন। কয়েকদিন পর তাকে ভারত হয়ে নেপালে নেওয়া হয়। সেখানে একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর কিছুদিন চিকিৎসা দিয়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
বাদীর দাবি, দেশে ফেরার পর চুক্তিকৃত ১০ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও পরিশোধ করা হয়নি। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও অভিযুক্তরা অর্থ লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।
মন্টু মিয়ার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, কিডনি প্রতিস্থাপনের পর থেকে তিনি আগের মতো শারীরিক পরিশ্রম করতে পারেন না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তার কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
জয়পুরহাট আদালতের আইনজীবী উজ্জ্বল হোসেন বলেন, মানুষের দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব বা আর্থিক সংকটকে পুঁজি করে বিদেশে নিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হলে তা শুধু প্রতারণাই নয়, একটি সংগঠিত অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন।
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন-সংক্রান্ত আইনের আওতায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
দারিদ্র্যকে পুঁজি করে মানবদেহের অঙ্গ নিয়ে প্রতারণার অভিযোগের এই ঘটনা মানবিক ও আইনগত উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। মামলার তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করছে।